সূত্রপাত হয়েছিল ইউনিলিভারের একটা চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি থেকে। আমরা ৯৬’ব্যাচ তখন তৃতীয় বর্ষের শেষে।সম্ভবত:২০০১ এর মার্চ বা এপ্রিল। মূহুর্তের মধ্যেই মিছিল, মিঠু ভাইর দোকানের ইউনিলিভার এর যত খালি কার্টুন ছিল রাস্তায় পুড়িয়ে শেষ। পন্যগুলো আমরা নষ্ট করিনি, তবে বর্জনের ঘোষনা দেয়া হয়েছিল। কারন, চাকুরীর একটা বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতা হিসেবে শুধুমাত্র বুয়েটের কথা উল্লেখ ছিল।
এর পর থেকে সবার মনেই ক্ষোভ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। যার চূড়ান্ত বহি:প্রকাশ ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। ঢাকা থেকে আইইবির একটা প্রতিনিধি দল আমাদের ক্যাম্পাস ঘুরতে আসে। আমরা ৯৬’ব্যাচ তখন চতুর্থ বর্ষে ক্যাম্পাসের লিডিং এ। সাথে ৯৭’ব্যাচ, ৯৮ ব্যাচ আর ৯৯ ব্যাচ, ২০০০ ব্যাচ সবে ক্যাম্পাসে এসেছে। কেন্দ্রীয় আইইবির সন্মানী সাধারন সম্পাদক ছিলেন আমাদের বিআইটি খুলনার খান মন্জুর মোর্শেদ ভাই। আমাদেরকে বললেন, সরকার সম্ভবত:বিআইটি গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষনায় আন্তরিক, তোমরা তুমুল আন্দলন শুরু কর।
যতদুর মনে পড়ে আইইবির প্রতিনিধি দলের সাথে বিলুপ্ত এক্স স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন অব বিআইটি খুলনার এর সাবেক সভাপতি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান স্যার, রিজু ভাইরা ছিলেন। আইইবির নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে আমি রেজাউল হক খোকা ভাই সহ কালবিলম্ব না করে আন্দোলনের ডাক দিই।
এদিকে খবর আসে বিআইটি চট্রগ্রাম আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। বিকসুর ক্যান্টিনে রাতে মিটিং করে ক্লাশ না করে আমরা বিআইটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ি। শিক্ষকরা শুরুতে আমাদের সাথে না থাকলেও বিআইটি থেকে পাশ করা শিক্ষকরা আমাদের উৎসাহ দেয়া শুরু করে। ডাইরেক্টর সামাদ স্যার, নওশের আলী মোড়ল স্যারদের সাথে আলোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নিই- সাধারন ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ক্লাশ শেষে আমরা আন্দোলন করব। বন্ধের দিন সকালেই আন্দোলন চলবে।
তবে, আমি, খোকাভাই, আমাদের ব্যাচের চপল, রাব্বি, মোজাম্মেল বাবু, শাখাওয়াত, শিমুল, তুহিন, মারুফ রেজা, মহব্বত; ৯৭ ব্যাচের বনি, জনি, সোহেল, হাবিব, আপেল, শোভন সহ গ্রুপ করে ক্লাশ না করে বিভিন্ন অফিসে স্মারকলিপি দিতে থাকি। তন্মধ্যে, খুলনা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের অফিস, খুলনা সিটি মেয়রের অফিস, বিভাগীয় কমিশনারের অফিস, পুলিশের ডিআইজির অফিস, স্হানীয় এমপি মহোদয়কে ইত্যাদি।
আর ক্যাম্পাসে, ফুলবাড়িগেট, খুলনা মহানগরীতে চলতে থাকে আমাদের মানববন্ধন, মিছিল, ব্যানার-পোষ্টার টানানো ইত্যাদি। মাঝেমধ্যেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের বিরূপ মন্তব্যের শিকার হতাম।
এরই মধ্যে খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে একদিন বিকালে আমরা মানববন্ধন ও প্রেসরিলিজ বিতরন শেষে জুনিয়র ৯৮ ব্যাচের রিয়াদ, জিয়া, রিপন, শিপলু, হিমুদেরকে দায়িত্ব দিয়ে আসি ব্যানারগুলো টানিয়ে দেয়ার জন্য। ক্যাম্পাসে ফিরে আসলে শুনি ৯৮’ব্যাচের জিয়া সন্ধ্যায় নিজে গাছে ব্যানার টানাতে গিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে মারাত্মক জখম হয়। গাছের পাশের ইলেকট্রিক তারে সম্ভবত: শক লেগেছিল। খুলনা মেডিকেলে জিয়া কয়েকদিন অচেতন ছিল পরে ঢাকা পাঠানো হয়েছিল।আমরা ওর আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম, আল্লাহর রহমতে জিয়া সুস্হ হয়ে ফিরে আসে।
যেহেতু নেতৃত্বে ছিলাম, ওর ঘটনায় নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল যে, কেন আমরা উপস্হিত না থেকে ওদেরকে রেখে এসেছিলাম? এ ঘটনায় আন্দোলন আরও তীব্রতা পায়। অবশেষে কাংখিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরের ঘোষনায় আমাদের একটা সফল, সকল মতের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহনের আন্দোলন শেষ হয়।
দীর্ঘ একমাসের অধিক ক্লাশ-পরীক্ষা বাদদিয়ে আন্দোলন আর স্মারকলিপি বিতরন আর আমাদের ব্যাচের রেগ-২০০২ এর কনভেনরের দায়িত্ব পালনে আমার রেজাল্ট যা হবার তাই হয়েছে। কিছু শিক্ষকের কুদৃষ্টি আর সিজিপিএর পতন! সামান্য কিছু মার্কসের জন্য ফাষ্টক্লাশ নিয়ে বেরুতে পারিনি। সেশনালে আমি বরাবরই এ প্লাস, এ বা এ মাইনাস পেতাম। সেখানে কয়েকটি সাবজেক্টে আমাকে সি দেয়া হয়েছে। যাক, সেগুলো নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আক্ষেপ নেই। স্রষ্টার কাছে শুকরিয়া।
আমাদের ও সকল বিআইটি’র সাবেক ও বর্তমান দল, মত নির্বিশেষে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের আন্তরিক সহযোগিতা আর সেই সময়ের আইইবির নেতৃবৃন্দের আন্তরিক সহযোগিতায় বিআইটিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়। বিআইটি, খুলনা থেকে কুয়েটে রুপান্তরের এটাই সংক্ষিপ্ত বাস্তব ইতিহাস। পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বনামে মাথা উচূকরে দাড়াক-সেই প্রত্যাশাই করছি। দূরহোক সকল হিনমন্যতা আর ভেদাভেদের মানসিকতা।ধন্যবাদ সবাইকে।
০২.০৯.২০২০
ড.প্রকৌ.মোঃজিয়াউল ইসলাম মজুমদার
৯৬’সিভিল, খানজাহান আলী হল,৩০৮
Image: Inside KUET