পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি একনেকে পাশ হওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পরিকল্পনা ও পানি সম্পদ মন্ত্রীদ্বয়কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এখানে সাবেক পানি উপদেষ্টা রিজওয়ানা আপাকেও ধন্যবাদ না জানালে একটা অকৃতজ্ঞতা থেকে যাবে। ২০১৭ সালে শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেলে প্রকল্পটির ডিজাইন ত্রুটি ও স্কোপ চেঞ্জ করার দাবী করলে, হাসিনা সরকার এটিকে বাক্স বন্ধী করে ফেলে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সেলফ থেকে বের করে প্রকল্পটি সচল করেন। কয়েক স্তরের ইভালুয়েশন, পিএসি, প্রি-একনেক পর্যন্ত করে জানুয়ারিতে একেনেকে উঠানোর সব আয়োজন সম্পন্ন করেন। তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা এত বড় প্রকল্প ইন্টেরিম আমলে পাশ করা উচিৎ হবে কিনা, কিংবা আরও অধিক সিভিল সোসাইটি ও এক্সপার্ট এনগেইজমেন্ট দরকার আছে কিনা তা নিয়ে অভিভাবক সুলভ মত দিলে, এটা পজিটিভ নোট সহ একনেক থেকে নেমে যায়। যদিও মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা দরকারে বিশেষ একনেক করে এটা পাশের ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন। (উল্লেখ্য, জানুয়ারিতে একনেকে তোলার ঘোষনা আসলে বাপা এবং কিছু ভারতপন্থী লোক সমালোচনা শুরু করেছিল!)

নির্বাচিত সরকার ধারাবাহিকতা রেখে, একনেকে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প পাশ করেছে। এখন টেন্ডার স্পেসিফিকেশন তৈরি, আন্তর্জাতিক টেন্ডার ডাকা, প্রি-টেন্ডার বিড, টেকনিক্যাল ও ফাইনান্সিয়াল ইভালুয়েশনের কাজ গুলো বিএনপি সরকার দ্রুত এগিয়ে নিবে, এই আশাবাদ রাখি।

পদ্মা ব্যারেজ ২০২৬ সালে শুরু হওয়াটা আমাদের জাতিগত ব্যর্থতার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ। ১৯৬১-৬২ থেকে ফারাক্কা পরিকল্পনার ঠিক পরপরই সমীক্ষা শুরু হওয়া প্রকল্প (মোট ৪টা সমীক্ষা করা হয়েছে), ২০২৬ সালে একনেকে পাশ হয়েছে। নির্মাণকাজ কিন্তু এখনও শুরু হয়নি। অর্থাৎ মরণ ফাঁদ ফারাক্কা পরিকল্পনার ৬৫ বছরেও আমরা তার রিস্পন্স করতে পারিনি। এর মধ্যে ভারত গঙ্গার বন্টন চুক্তিমত পানি হিস্যার ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। সুন্দরবন ও পুরো দক্ষিণ বঙ্গের মাছ, গাছ ও মানুষ, প্রাণ ও প্রকৃতি, শুষ্ক মৌসুমে পানি স্বল্পতায় ও স্যালাইন পেনিট্রেশনে বিপর্যয়ে পড়েছে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

আমার পরামর্শ হচ্ছে, প্রকল্পটির মেদায়কাল ৭ বছর না রেখে, সম্ভব হলে সাড়ে চার বছর করুন। এবং এমনভাবে করুন যাতে বিএনপি তার বর্তমান মেয়াদকালেই তারেক রহমানের মাধ্যমে এটা উদ্ভোদন করতে পারেন। ভালো ঠিকাদার নিয়োগ দিলে এটি সম্ভব, সময় বাঁচাতে পারলে খরচও ভবিষ্যতে বাড়বে না। বিএনপি সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়, যমুনা সেতু উদাহরণ। বিএনপি কাজটা সিঙ্ঘভাগ করেছে, অথচ আওয়ামীলীগ ক্রেডিট নিয়েছে, নামটা আজও বঙ্গবন্ধু সেতুই রয়ে গেছে!

পাশাপাশি, আমার ৩টা স্পেসিফিক যায়গায় আগ্রহ ছিল প্রকল্পটা নিয়ে, শেয়ার করি-

১। ফারাক্কার ১৮০ কিলোমিটার ভাটিতে ব্যারেজ করলে বর্ষায় মধ্যবর্তী এলাকায়, ফারাক্কা যেমন বিহারের বন্যা ও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, সেরকম কিছু হবে কিনা!

> পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য হচ্ছে, পদ্মা ব্যারেজে বর্ষাকালে সব গেট খোলা রাখা হবে। তাই ব্যারেজের কারণে উজানে কৃত্রিম বন্যা বা ব্যাকওয়াটার বন্যার সম্ভাবনা নেই বা একেবারেই কম।

তবে কথা আছে, এখন (মে’২৬) বর্ষাকাল নয়, কিন্তু দেশে অকাল বন্যা হচ্ছে। ফলে ব্যারেজের গেট অপারেশনের সাথে রেইন ফোরকাস্ট ও অববাহিকা ভিত্তিক রেইনফল ক্যাল্কুলেশন আমলে নিয়ে মর্ডার্ণ হাইডোলজিক্যাল মডেলিং সেন্ট্রিক অপারেশনে যেতে হবে। ডেটা একিউরিসি এখানে গুরুত্বপুর্ণ, আমাদের ডেটা এনালিসিস কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ। শুধু বাংলাদেশের সীমানায় বৃষ্টির হিসাব নয়, বরং ভারতেও গঙ্গা অববাহিকায় সম্ভাব্য বৃষ্টির হিসাব নিয়ে কাজটা আমাদেরই করতে হবে। ধরে নিবেন যে, ভারত মৌসুম ও মৌসুমের বাইরের অতি বৃষ্টিজনিত ফারাক্কা গেট অপারেশনের তথ্য দিবে না। অর্থাৎ ফারাক্কার রিজার্ভ পানি অতি বৃষ্টি ও বর্ষায় বিহারে যখন বন্যা পরিস্থিতির উদ্রেক করে, তখন তার ড্রেন-আউট চাহিদা আমাদেরই ক্যাল্কুলেট করে নিতে হবে। নাইলে ফারাক্কা ব্যারেজ ও পদ্মা ব্যারেজের মধ্যকার অঞ্চলে ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ক্ষতিজনিত বিপদ হতে পারে। টেন্ডার স্পেশিফিকেশনে এটা যাতে ইঙ্কলুড রাখা হয়- এটা আমার পরামর্শ।

> ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রযুক্তি অতি পুরানো। পদ্মা ব্যারেজে ১৪ মিটার হাইট এর ১৮টা আন্ডার স্লুইস আর ২টা কাটার সাকশন ড্রেজার থাকায় পলি ফ্লাশিংয়ের ক্ষমতা ফারাক্কার চেয়ে অনেক বেশি থাকবে।

তাই সঠিক অপারেশনের মাধ্যমে উজানে পলি জমে রিভার বেড লেভেল উঁচু হওয়ার সম্ভাবনা কম হবে। ফারাক্কায় পলি ফ্লাশিং ক্ষমতা কম আর স্লুইস নিয়মিত না খোলার কারণে রিভার বেড লেভেল উঁচু হয়ে উজানে বন্যা বেড়েছে।

২। ইউরোপ এ নদীর প্রবাহ ঠিক রাখতে শাখা নদী ও আর্টিফিশিয়াল ক্যানেল গুলোতে ডুবো বাঁধ করা হয় ওয়াটার লিফটিং এর ব্যবস্থা থাকে, এতে নৌ চলচল, নাব্যতা এবং পানির আধার ঠিক থাকে।

পদ্মা ব্যারেজের প্রস্তাবনায় ইউরোপের মতো শাখা নদীতে ডুবো বাঁধ + ওয়াটার লিফটিং সিস্টেম রাখা হয়নি। তবে গড়াই-মধুমতি নদী সিস্টেম, হিসনা-মাথাভাংগা নদী সিস্টেম এবং চন্দনা-বারাশিয়া নদী-সিস্টেমে পানি সংগ্রহ অবকাঠামো নির্মান করা হবে। এগুলোর মাধ্যমে শাখা নদী গুলোতে পানি প্রবেশ করানো হবে বলে আমরা জানতে পেরেছি।
আমি মনে করি, শাখা নদী ও অপরাপর রিভার সিস্টেম গুলাতেও স্লুইস সিস্টেম, সাকশন ড্রেজার এবং সিল্ট ফ্লাশিং এর সক্ষমতা বিবেনায় রাখা উচিৎ। বিষয়টা টেন্ডার স্পেসিফিকেশনে যুক্ত করা যেতে পারে। ছোট নদী হলেও গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাংগা, চন্দনা-বারাশিয়া নদী, এদেরও জালিকার মত খালের নেটওয়ার্ক আছে। বন্যা ও সিল্টেশনের সমস্যা সেখানেও আছে। আমাদের ছোট নদীও পৃথিবীর অনেকের দেশের বড় নদীর মত।

৩। গঙ্গা বিশ্বের সর্বোচ্চ পলিবাহিত নদীর একটি। ব-দ্বীপায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে কিনা।

ফারাক্কার স্লুইস হাইট ৭.৯৩ মিটার, পদ্মার ১৪.০ মিটার। হাইট প্রায় দ্বিগুন হওয়ায় হাইড্রোলিক হেড বেশি, ফলে পলি ফ্লাশ করার ক্ষমতা অনেক বেশি। সাথে ২টা কাটার সাকশন ড্রেজার রয়েছে।
তাই পদ্মা ব্যারেজে সঠিক অপারেশন করলে আসা পলির ৮৫-৯০% ফ্লাশ করা সম্ভব। এতে ডাউন স্ট্রিমে পলির প্রবাহ বজায় থাকবে এবং ব-দ্বীপায়ন প্রক্রিয়া ঠিক থাকবে। তবে শর্ত হলো বর্ষায় ও বন্যায় স্লুইস নিয়মিত খুলে ফ্লাশিং করতে হবে।

অবশ্যই ১১৩ মেগাওয়াট গ্রিন হাইড্রো পাওয়ার এই প্রজেক্টের একটা আশাবাদি সংযোজন।

সবমিলে, আমরা প্রকল্পটার বাস্তবায়ন এবং এর অপারেশন এক্সিলেন্স নিয়ে আশাবাদী। এটা নাব্যতা, পানি প্রাপ্যতা, লবনাক্ততা, সেচের সমস্যা গুলোকে এড্রেস করবে। কৃষি, পরিবেশ এবং সুন্দরবন বাঁচাবে।

এটা এমনভাবে বাস্তবায়ন করা চাই যা, উজানের ভাঙ্গন এবং ভাটির পলি পতনের বিষয়গুলো এড্রেস করবে। অবশ্যই যে কোনো ব্যারেজ, নদি শাসনের বন্যা ও ভাংগনজনিত ক্ষতি থাকবে। আমাদেরকে এমন প্রযুক্তি এবং ব্যারেজ অপারেশন এনশিউর করতে হবে, যাতে ফারাক্কা জনিত ক্ষতির বিপরীতে টোলাল ইকোনোমিক ও ইনভায়রনমেন্টাল ইউটিলিটি এবং সাংখ্যিক লাভ অনেক বেশি হয়।

১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা দিবস। ফারাক্কা বাঁধ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে খরা ও মরুকরণ তীব্র করে, বর্ষায় হঠাৎ বন্যা তৈরি করে কৃষক ও পরিবেশের মরণফাঁদ হয়ে উঠেছে। পানি বঞ্চনা এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ বাঁধটি নানাবিধ জন-দুর্দশার সৃষ্টি করেছে। ব্যাপকভাবে মানব ও পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে যে মহা ক্ষতি ভারত বাংলাদেশের জন্য তৈরি করেছে, এই ধ্বংসলীলা থেকে পদ্মা ব্যারেজ আমাদের অনেকখানি ড্যামেজ কন্ট্রোল করবে।

মরণ ফাঁদ ফারাক্কা চালুর ৫২ বছর পরে বাংলাদেশ ওয়াটার ম্যানেজমেন্টে তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রকল্পটির যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। এর সর্বাত্মক সাফল্য কামনা করি। আমি প্রকল্পের ডিপিপি, সমীক্ষা প্রণয়নকারী এবং এতে কন্ট্রিবিউশান করা সকল কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করি।