আইভোরি কোস্ট এবং কুরাসাও-এর খেলা। আজকে জিতলে বা ড্র করলেই আইভোরি কোস্ট তার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নক-আউট রাউন্ডের জন্য কোয়ালিফাই করবে। [Won 2:0]

আমি বড় হইসি আইভোরি কোস্টের একটা গোল্ডেন জেনারেশনের খেলা দেখতে দেখতে। ডিফেন্স আর মিডফিল্ডে ছিলেন দুই ভাইঃ কোলো আর ইয়াইয়া টৌরে। তাদের সাথে খেলতেন সলোমন কালু, ইম্যানুয়েল এব্যুয়ে এবং জারভিনহো।

আর এই পুরো দলটাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতেন আফ্রিকার অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার, চেলসির লিজেন্ড দিদিয়ের দ্রগবা। দ্রগবার কথা উঠলেই সবার একটা ঘটনা মনে পরার কথা।

২০০৫ সাল। আইভোরি কোস্ট প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের জন্য কোয়ালিফাই করেছে, অথচ দেশে তখন গৃহযুদ্ধ চলছিলো। ড্রেসিংরুমে দ্রগবা তার পুরো দলকে নিয়ে, মাটিতে বসে, করজোড়ে পুরো দেশের কাছে অনুরোধ করলেন, “আপনারা পরস্পরকে ক্ষমা করুন, ক্ষমা করুন! এতো সম্পদশালী একটি আফ্রিকান দেশে গৃহযুদ্ধ মেনে নেওয়া যায় না। আপনারা অস্ত্র সমার্পন করুন, নির্বাচন আয়োজন করুন। দেখবেন, সব ঠিক হয়ে যাবে”।

এবং দ্রগবার আহ্বানে সত্যি সত্যি-ই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়। দুই পক্ষ শান্তি আলোচনায় বসে। দেশটির কোটি কোটি নাগরিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ফুটবল তার জাদুবলে একটি বিভাজিত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে— এটা তার সবচাইতে বড় উদাহরণ হিসেবেই আমাদের কাছে পরিচিত।

This may be a nice sentiment, but is also completely false.

যেসব রাষ্ট্রকে সৃষ্টিই করা হইসে ব্যর্থ হওয়ার জন্য, সেখানে ফুটবল খুব একটা কাজে আসে না। দ্রগবাও তাই গৃহযুদ্ধ থামাতে পারেন নাই। আর এই ব্যর্থতার উপরেই দাঁড়িয়েই বড় হইসেন বর্তমান আইভোরি কোস্ট দলের সবচেয়ে বড় তারকা।

কেউ যদি অল্প সময়ের মধ্যে আফ্রিকার ভৌগলিক বৈচিত্র্য দেখতে চায়, তবে তার আইভোরি কোস্টে যাওয়া উচিত। উত্তরে মরুভূমি আর দক্ষিণের উপকূলে ঘন, আর্দ্র রেইনফরেস্ট; আর এই দুই বিপরীত পরিবেশের মাঝখানে আছে উষ্ণ, খরাপ্রবণ বিস্তৃণ তৃণভূমি।

এই ভৌগলিক পার্থক্যের কারণে দেশটির দুই প্রান্তে গড়ে উঠেছিলো দুই ধরণের সমাজব্যবস্থা। উত্তরের বড় রাজ্যগুলোর শাসকরা পুরো আফ্রিকার সাথে বাণিজ্য করতেন, আর দক্ষিণের দুর্গম জঙ্গলে গড়ে উঠেছিলো অসংখ্য, গ্রাম-কেন্দ্রিক ছোট-ছোট রাজ্য। তারা মূলত ইউরোপিয়ানদের কাছে হাতির দাঁত বিক্রি করতেন, সে কারণেই দেশটার বর্তমান নাম আইভোরি কোস্ট।

১৮৪২ সাল থেকে দেশটির উপকূলে ফ্রান্সের উপস্থিতি থাকলেও, তারা মূলত গজদন্ত আর ক্রীতদাস সংগ্রহ করেই যথেষ্ট খুশি ছিলো।

১৮৮৪ সালে ইউরোপের সব পরাশক্তি বার্লিনে বসে, নিজেদের মধ্যে পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। অন্য অনেক উপনিবেশের পাশাপাশি ফ্রান্সের ভাগ্যে জোটে আইভোরি কোস্ট। কিন্তু এই পুরো বন্দোবস্তে একটা শর্ত ছিলো— কলোনি শুধু দাবি করে বসে থাকলেই হবে না, সত্যিকার অর্থে সেটাকে নিয়ন্ত্রণও করতে হবে।

আর সে কারণেই বার্লিন কনফারেন্সের পর ফ্রান্স আইভোরি কোস্টে “নিয়ন্ত্রণ” প্রতিষ্ঠা শুরু করে। দেশটির উত্তরে ফরাসিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করেন সামোরি টৌরে, যিনি একাধারে ছিলেন একজন আলিম, একজন দক্ষ সেনাপতি এবং মানডিংকা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।

কিন্তু আইভোরি কোস্টের দক্ষিণে অবস্থা ছিলো আরো ভয়ংকর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গ্রামগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ফরাসিরা শুরু থেকেই গ্রামের পর গ্রাম, হাজার হাজার একরের ক্ষেত এবং বাগান পুড়িয়ে দেওয়া শুরু করে; পাইকারি দরে গণহত্যার কথা তো বাদই দিলাম।

১৯১০ সালে যখন আইভোরি কোস্টে ফরাসিদের নিয়ন্ত্রণে আসার পর দেখা গেলো, এক সময়ের জনবহুল গ্রামগুলো বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে এবং দেশটির দক্ষিণের জনসংখ্যা স্থায়ীভাবে কমে গেছে।

দেশটা চালাতে গিয়ে ফ্রান্স আবিষ্কার করলো, এখানে প্রচুর সম্পদ থাকলেও প্রায় কোনো ধরণের অবকাঠামো নাই। এই জটিল সমস্যার একটা সহজ সমাধান তাদের কাছে ছিলোঃ দাসপ্রথা।

প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষকে ফরাসি মুদ্রায় একটা নির্দিষ্ট ট্যাক্স দিতে হতো, আর ফরাসি মুদ্রা পাওয়ার জন্য তাদের রাবার, কোকো বা কফি উৎপাদন করতেই হতো। অন্যদিকে ফরাসি প্রশাসকরা চাইলেই একজন কৃষ্ণাঙ্গকে যে কোনো কাজ করাতে বাধ্য করতে পারতেন; সেটা রেললাইন বানাতে হোক অথবা শ্বেতাঙ্গ ফরাসি খামারিদের কফির বাগানে হোক।

আইভোরি কোস্টের মূল পণ্য হয়ে ওঠে এই কোকো আর কফি। আর সেসব বাগানে কাজ করার জন্য প্রচ্চুর মানুষ দেশটির উত্তরের সাহেল অঞ্চল থেকে দক্ষিণে চলে আসেন। কিন্তু এই বিরূপ পরিবেশেও কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকরা কোকো চাষ করতে থাকেন এবং একটা পর্যায়ে ধলা ফরাসিদের খামারের সাথেও টক্কর দেওয়া শুরু করেন।

ফেলিক্স ওফুয়েত-বোয়ানি ছিলেন এরকমই একজন ধনী কৃষক। ফরাসি এবং আফ্রিকান কমিউনিস্টদের সহযোগিতায় তিনি ১৯৪৬ সালে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমের নিয়ম বাতিল করতে সক্ষম হন। কিন্তু ‘৫০-এর দশকে কমিউনিস্টদের ওপর নির্যাতন শুরু হলে বোয়ানি ইউটার্ন নিয়ে ফ্রেঞ্চ সরকারের পক্ষ নেন।

ফরাসিরাও অনুধাবন করতে পারে, এই অঞ্চলে বোয়ানির চাইতে ভালো দালাল তারা আর পাবে না। ফলে ১৯৬০ সালে বোয়ানির অধীনেই আইভোরি কোস্টকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়।

কাগজে কলমে স্বাধীনতা দিলেও নিজেদের কলোনির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার কোনো ধরণের ইচ্ছা ফ্রান্সের ছিলো না। তাই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা, ব্যবসায়ী জেমস ফোকার্টের তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয় “ফ্রান্সাফ্রিক” নামের একটা ব্যবস্থা।

ফ্রান্স থেকে মুক্তি পাওয়া প্রত্যেকটি দেশে থাকবে ফরাসি সামরিক ঘাঁটি, প্রত্যেকটি সরকারে থাকবে ফরাসি উপদেষ্টা আর সবগুলো দেশের ব্যাংকের রিজার্ভ রাখা হবে ফ্রান্সে। ফরাসি কোম্পানিগুলোই সেসব দেশের রেল পরিবহণ, বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে। আর ফ্রান্সের সরকার নিজে সেই দেশগুলোর শাসকদের টাকা পয়সা-সহ বিভিন্ন ধরণের সুবিধা দিয়ে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে।

এই ক্ষেত্রে জেমস ফোকার্টের প্রধান চামচা ছিলেন বোয়ানি। ফরাসিদের তাবেদারি করে তিনি প্রায় ৩০ বছর এক দলীয় শাসন কায়েম রাখেন, এমনকি এই “ফ্রান্সাফ্রিক” নামটাও তারই দেওয়া।

এদিকে কোকো এবং কফির দাম কমে যাওয়ায় আইভোরি কোস্ট ১৯৮৭ সালে দেউলিয়া হয়ে পরে। সাথে সাথেই IMF হাজির। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক চাপে বাধ্য হয়ে বোয়ানি ১৯৯০ সালে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেন এবং তিন বছর পর অক্কা পান।

ক্ষমতা দখল করেন হেনরি বেডেই। নিজের শাসনকে বৈধতা দিতে তিনি আমদানী করেন এক নতুন ধারণার, নাম “আইভোরিয়াইট”। এই মতাদর্শের সারকথা হচ্ছে, দক্ষিণের আদি বাসিন্দারাই আসলে আইভোরি কোস্টের নাগরিক হওয়ার যোগ্য। আর দেশটার উত্তরাঞ্চল বা প্রতিবেশি দেশ থেকে যারা আসছে, তারা কেউ নাগরিক হতে পারবে না।

বলে রাখা ভালো, ততদিনে আইভোরি কোস্টের জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ হয় অন্য দেশের নাগরিক অথবা বংশদ্ভুত। এদের প্রায় সবাই ছিলেন বৈধ অধিবাসী, আইভোরি কোস্টের কোকো চাষ এদের ছাড়া ছিলো অসম্ভব। কিন্তু ক্ষমতার দ্বন্দ্বে এদেরকেই বলির পাঁঠা বানানোর ব্যবস্থা করা হলো।

একটি সামরিক অভ্যুত্থানে বেডেই ক্ষমতাচ্যুত হলেও ততদিনে যা হবার তা হয়ে গেছে। পুরো দেশ তখন উত্তর-দক্ষিণ, মুসলমান-খ্রিষ্টানে বিভক্ত।

২০০০ সালের নির্বাচনে উত্তরাঞ্চলের প্রার্থী আলাসঁ ওয়াতারাহ-এর প্রার্থীতা বাতিল করা হয়। এর প্রতিবাদে ২০০২ সালে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ ঘটে, শুরু হয় আইভোরি কোস্টের গৃহযুদ্ধ। অন্য সব আফ্রিকান গৃহযুদ্ধের মতো এখানেও দুই পক্ষই বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যা সংঘটিত করসে।

এবং অন্য দেশের মতো এখানেও মূল ভিক্টিম ছিলেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা আইভোরি কোস্টে একটা বড় ইস্যু হয়ে ওঠে।

তিন বছর এভাবে কাটার পর দ্রগবার আহ্বানে দুই পক্ষই শান্তি চুক্তিতে বসে। ঠিক হয়, ২০১০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সে নির্বাচনে ওয়াতারাহ জিতলেও সংসদ সেটা মেনে নিতে রাজী হয় নি। ফলে শুরু হয় আরেকটা গৃহযুদ্ধ, যেখানে ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ মানুষ মারা যান।

এই গৃহযুদ্ধের সময় বর্তমান আইভোরি কোস্ট দলের স্টার ইয়ান ডিয়ামন্ডের বয়েস ছিলো মাত্র ৬।

যুদ্ধকালীন এবং তার পরবর্তী সময়ে দেশটির ভেঙে পড়া আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বড় হওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে ডিয়ামন্ডে নিজেই লিখেছেন। লিখেছেন একটি ফ্ল্যাটে ২৫ জন মানুষ গাদাগাদি করে থাকার অভিজ্ঞতা। এই কঠিন সময়ে ডিয়ামন্ডের পাশে ছিলো তার ছোটবোন রোক্সান।

বহু কষ্টের পর ডিয়ামন্ডের পেশাদার ফুটবলে অভিষেকের দিন-ই ১৫ বছরের রোক্স্যান মারা যায়। কেউ একটি পার্টিতে তার গ্লাসে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলো। দুইটি গৃহযুদ্ধের পর এটাই ছিলো আইভোরি কোস্টে নারীদের নিরাপত্তার অবস্থা।

এখনও আইভোরি কোস্ট এবং পার্শ্ববর্তী ঘানার কোকো বাগানে সাড়ে ১৫ লক্ষের বেশি শিশু কাজ করে। এর মধ্যে অনেককে পাশের দেশগুলো থেকে পাচার করে ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করানো হয়। নেসলে, মার্স, হার্শি, কারগিল—যার চকলেটই আপনি খান না কেনো, তার মধ্যে আধুনিক ক্রীতদাসদের ঘাম লেগে আছে।

ফ্রান্সাফ্রিকের ভূত এখনও আইভোরি কোস্ট ছাড়ে নাই। দেশটিতে ফ্রান্সের সামরিক ঘাঁটি আছে, ফরাসি কোম্পানিগুলোই এখনও দেশটিং ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, কৃষি এবং জ্বালানী খাত নিয়ন্ত্রণ করে। দেশটির মুদ্রানীতি এখনও ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে।

দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধের শেষে, ২০১১ সালে ফরাসি কমান্ডোরা অপারেশন চালিয়ে ওয়াতারাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে যায়। সেখান থেকে এই বান্দা আর কোনো নড়াচড়া করে নাই। দেশটার গণতন্ত্রের অবস্থা এতোটাই ভালো (!) যে দিদিয়ের দ্রগবা ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনেও জিততে পারেন নাই।

বিশ্বকাপের নক আউটে কোয়ালিফাই করলে আইভোরি কোস্ট থেকে ফ্রান্সের প্রভাব বা শিশুশ্রম— কোনোটাই চলে যাবে না। যেসব দেশ মৌলিকভাবেই ভঙ্গুর, সেখানে ফুটবলের পক্ষে বেশি কিছু করা সম্ভব না।

তবুও আমি চাই আইভোরি কোস্ট নক আউট খেলুক, টুর্নামেন্টে অনেকদূর যাক। ফুটবল আবারও দেশটির মানুষের কাছে সান্ত্বনা এবং অনুপ্রেরণা হয়ে ফিরে আসুক।

ছবিঃ কোকো খামারে কাজ করা একজন শিশু শ্রমিক, বামে ইয়ান ডিয়ামোন্ডে, ডানে দিদিয়ের দ্রগবা।

Writing: Readus Salehen Jawad