হাতে পেলাম দারুণ একটা বই, “প্রকৌশল খাতের সংকট ও সংস্কার প্রস্তাবনা”। পড়তে পড়তে মনে হলো, এই খাতে আসলে কী ঘটছে তা সবার জানা দরকার।

কারণ প্রশ্নটা শুধু প্রকৌশলীদের চাকরির গ্রেড বা পদোন্নতির নয়। প্রশ্নটা হলো, একটা রাষ্ট্র কোনো পেশায় যোগ্যতা, নিয়োগ ও দায়িত্বের ন্যূনতম মানদণ্ড কীভাবে ঠিক করবে?

একজন প্রকৌশলী তৈরি হতে লাগে চার বছরের কঠিন পরিশ্রম, তীব্র প্রতিযোগিতামূলক ভর্তিযুদ্ধ, আর পদার্থবিদ্যা, গণিত ও প্রকৌশলবিদ্যার গভীর তাত্ত্বিক ভিত। অথচ সেই পদটাই আজ যোগ্যতা দিয়ে নয়, কোটার সিঁড়ি বেয়ে দখল হয়ে যাচ্ছে।

শুধু একটা সংখ্যা ভাবুন। ডিপিডিসিতে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ ২০১৯ সালে ছিল ৪৩, ২০২৫ সালে নেমে এসেছে মাত্র ৯ জনে। গেজেটে পদোন্নতির কোটা ৩৩%, কিন্তু বাস্তবে কোথাও তা ৫০%, কোথাও ৬৭%, কোথাও ১০০%। মেধাবী তরুণ প্রকৌশলীর প্রবেশপথটা তাহলে থাকল কোথায়?
ফল আমরা সবাই দেখছি। কেউ পাস করেই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, কেউ চলে যাচ্ছেন বিসিএস বা ব্যাংকে, কেউ পেশাটাই ছেড়ে দিচ্ছেন। এটা কয়েকজন মানুষের বঞ্চনা নয়, একটা জাতির অবকাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। দুর্বল প্রকৌশল খাত শুধু সেতু, সড়ক আর বিদ্যুৎকে দুর্বল করে না, একটা জাতির স্বপ্নও ভেঙে দেয়।

প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের তিন দফা দাবি আমার কাছে সম্পূর্ণ যৌক্তিক, আইন ও সংবিধানের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।

এক, ৯ম গ্রেড বা সহকারী প্রকৌশলী পদে প্রবেশ হোক শুধু নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ বিএসসি ডিগ্রিধারীদের জন্য। কোটা বা ছদ্মনামে পদ বানিয়ে পদোন্নতি নয়।
দুই, উপ-সহকারী প্রকৌশলীর ১০ম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষা ডিপ্লোমা ও বিএসসি উভয়ের জন্য উন্মুক্ত হোক, প্রতিযোগিতাটা হোক মেধায়। সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদ সবার সমান সুযোগের নিশ্চয়তা দেয়, উচ্চতর যোগ্যতা কখনো প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না।
তিন, বিএসসি ডিগ্রি ছাড়া “প্রকৌশলী” পদবি ব্যবহারের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ডাক্তার হতে যেমন নির্দিষ্ট যোগ্যতা লাগে, আইনজীবী হতে যেমন সনদ লাগে, প্রকৌশলী পরিচয়েরও তেমন সুরক্ষা থাকা দরকার।

জোর দিয়ে বলি, এই দাবি ডিপ্লোমাধারীদের বিরুদ্ধে নয়। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান দেশের সম্পদ। কিন্তু তাঁকে কোটায় প্রকৌশলীর চেয়ারে বসালে আমরা একদিকে একজন ভালো টেকনিশিয়ান হারাই, অন্যদিকে পাই একজন দুর্বল নীতিনির্ধারক। তাঁদের সম্মানজনক বেতন, পদোন্নতি ও মর্যাদা অবশ্যই নিশ্চিত হোক, তবে তা প্রকৌশল খাতের মৌলিক কাঠামো ভেঙে নয়।

গতকাল প্যানেলেও কয়েকটা কথা বলেছিলাম, সেগুলোই এখানে যোগ করি।

এক, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয় কোনো না কোনোভাবে প্রকৌশলীদের হাত ধরেই হয়, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক, সবকিছু। অথচ নীতিনির্ধারণের টেবিলে প্রযুক্তির কণ্ঠ প্রায় অনুপস্থিত। উন্নত দেশগুলোর মতো সরকারেরও একজন চিফ টেকনোলজি অফিসার (সিটিও) থাকা উচিত, যিনি এই বিশাল কারিগরি ব্যয়কে যোগ্য দিকনির্দেশনা দেবেন।

দুই, সরকারি সব পদোন্নতি হতে হবে পারফরম্যান্সভিত্তিক, ঠিক যেমনটা এখন প্রায় সব খাতেই হচ্ছে। বছর গুনে বা কোটা মেপে নয়, কাজের মূল্যায়নেই এগিয়ে যাক মানুষ।

তিন, বেসরকারি খাতের প্রকৌশলীদের জন্য একটা ন্যূনতম বেতন কাঠামো চাই। মেধা যদি মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি হয়, তবে সেই মেধা যে খাতেই কাজ করুক, তার একটা ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা থাকতে হবে। সরকারি ও বেসরকারির বৈষম্য না কমালে মেধা ধরে রাখা যাবে না।

চার, প্রকৌশল শিক্ষার সব সিলেবাসকে BAETE (Board of Accreditation for Engineering and Technical Education) এর অ্যাক্রেডিটেশনের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের পূর্ণ স্বাক্ষরকারী হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিটি প্রোগ্রামে বাধ্যতামূলক করলে যোগ্যতার প্রশ্নে আর কোনো ধোঁয়াশা থাকবে না।

শেষ কথাটা সহজ। প্রকৌশল খাত কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের সম্পত্তি নয়, এটা রাষ্ট্রের অবকাঠামো গড়ার মূল কারিগরি শক্তি। যোগ্যতার মূল্য কমিয়ে দিলে প্রকৌশলীরা তো বটেই, দুর্বল হয় প্রকল্প, দুর্বল হয় অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা দেশ।

দেশটাকে মেরিটোক্রেসির পথে হাঁটতে হবে। যোগ্যতাই ঠিক করুক পদ, সংগঠনের চাপ বা কোটার হিসাব নয়। তাহলেই প্রকৌশলী জিতবেন, ডিপ্লোমাধারীরাও তাঁদের ন্যায্য জায়গা পাবেন, আর সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ।